cool hit counter
সর্বশেষ প্রকাশিত

প্রবাসে পরবাসে

আমেনা বেগম ছোটন

হজ্জে গিয়ে দুই বাংলাদেশির দেখা। কথায় কথায় জানা গেল দুজনেই আমেরিকা প্রবাসী। ত আমেরিকার কোথায় থাকা হয়, জিজ্ঞেস করলে প্রথম ভদ্রলোক জানালেন তিনি ফ্লোরিডা থাকেন।
দ্বিতীয় ভদ্রলোক একটু তাচ্ছিল্যের স্বরে বল্লেন, সে ত শুনেছি একেবারে জংগলে ভরা গন্ডগ্রাম। সাপ খোপে ভরা।
দ্বিতীয় ভদ্রলোকের আবাস জিজ্ঞেস করা হলে তিনি গর্বের সাথে জানালেন তিনি নিউইয়র্ক থাকেন। প্রথম ভদ্রলোক হাসিমুখে বল্লেন, সেও ত শুনেছি একেবারে বস্তি এলাকা। আনকালচারড ডিভি পাওয়া, ইল্লিগাল এলিয়েনে ভরা। থাকেন কি করে এদের মধ্যে?

ইনারা হজ করতে এসেছেন, এই রকম মনোভাব নিয়ে।গল্প টা আমার বড় আপার মুখে শোনা, সত্য- মিথ্যা জানি না। আমরা বাংলাদেশি রা বড ক্লাস সচেতন। আমি ছাড়া দেশ টা ছোট লোকে ভর্তি, এরকম ধারনার মানুষ নেহায়েত কম না। ছোটলোকের মধ্যেও ক্লাস আছে, সিএঞ্জি আলার কাছে রিক্সাওয়ালা ছোটলোক। রিক্সাওয়ালার কাছে ভাংগারি ওয়ালা। ড বা অন্যান্য পেশা জীবিদের মধ্যেও আছে। আমি ডিএমসির, তুই বগুড়া মেডিকেল। আমি সরকারী, তুই প্রাইভেট। আমি ঢাকার প্রাইভেট, তুই মফস্বলের প্রাইভেট। আমি ঢাকা ভার্সিটি, তুমি কিন্তু ন্যাশনাল ভার্সিটি, ইত্যাদি ইত্যাদি।

অস্ট্রেলিয়া তেও বাঙ্গালি ক্লাস মেনে চলে। আশরাফ শ্রেণী হল স্কিল মাইগ্রেন্ট পিপল, ড, ইঞ্জিনিয়ার বা সায়েন্টিস্ট হয়ে জব নিয়ে অস্ট্রেলিয়া এসেছে। সমগোত্রীয় লোকজন ছাড়া অন্য কাউকে দেখলে জিজ্ঞেস করে বসে আপনি ড না ইঞ্জিনিয়ার? ইনারা পার্টি দিলে সেখানে সাধারণ মিডল ক্লাস লোক গিয়ে অস্বস্তি বোধ করে। বেচারা ট্যাক্সি ড্রাইভার, সিকিউরিটি গার্ড, রিটেইল ওয়ার্কার। এই জ্ঞানী গুণি দের সাথে কি নিয়ে আলাপ করবে? এক ড মহিলা পার্টি তে এলেন একা, সবাই জিজ্ঞেস করল, ভাবি আপ্নার হাসবেন্ড এল না? ড হেসে জানালেন, ও ত ড- ইঞ্জিনিয়ার না, এই পার্টি তে এসে ও কি করবে?

মিডল ক্লাস হচ্ছে স্টুডেন্ট ভিসায় ঢুকা বাঙ্গালি গ্রুপ, সম্ভবত এরাই সং্খ্যাগুরু গ্রুপ। যদিও আশরাফ শ্রেণী এদের খুব একটা পাত্তা দেয় না। স্টুডেন্ট লাইফে ইউনির ফি, জীবন ধারন এসব মেইন্টেইন করতে এরা কিচেন হ্যান্ড, ক্লিনার, কার ওয়াশ এটাইপের কাজ করেছে, করতে হয়েছে। এই মিডল ক্লাস আবার এইসব খুব মনে রাখে, এদের নিজেদের মধ্যে কাউকে একটা মার্সিডিজ চালাতে দেখলে সংগে সংগে বলে দেবে এ ত আগে ক্লিনার ছিল। শপিং মলে গার্বেজ ক্লিন করত, ফ্লোর মুছত।এর বাইরে আছে কিছু পলিটিক্যাল এসাইলাম এ আসা ধান্দাবাজ রিফিউজি পিপল। এরাও জাতে উঠার প্রাণপণে চেষ্টা করে, লেখাপড়ার ঋণ নেই, মানবাধিকার সংস্থা থেকে সাহায্য ওয়ার্ক পারমিট পেয়ে এরা ভালই থাকে। আপার ক্লাস এদের সাথে মেশে উইথ কিপ ইন মাইন্ড, এরা কিন্তু রিফিউজি।

এর বাইরে একটা শ্রেণী আছে। আমি যখন এদের দেখতাম মনে হত সামথিং ডিফারেন্ট। এরা বাংলাদেশী, কিন্তু আমাদের মত না। কেমন আন্সমার্ট গেট আপ, কথা বলে একেবারে আঞ্চলিক ভাষায়। উপরের দুই গ্রুপের মত ক্লাসি পিপল না। এরা কারা? আবির সাহেব জানালেন এরা বোট পিপল। বোট পিপল কি জানেন ত? এরাও একরকম রিফিউজি। ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়া থেকে জীবন বাজি রেখে বোটে করে অস্ট্রেলিয়া ঢুকে পরা মানুষ। শিক্ষা দীক্ষা বলে তেমন কিছু নেই। সাধারণত গায়ে খাটা অড জব করে। আমরা ক্লাসি পিপল রা এদের সাথে একেবারে মিশতে চাই না, একেবারে ছোটলোক না এরা? একটু হিংসাও করি, অস্ট্রেলিয়ার সিটিজেনশিপ পেতে আমাদের কত কষ্ট করতে হয়, বেহুদা ইউনিতে পড়, আজাইরা কোর্স কর যেসব প্রফেশনে কেউ যাবে না, স্টুডেন্ট লাইফে বিশ ঘন্টার বেশি কাজের পারমিট নাই, এতে চলা যায়?আইল্টস এ ইচ ব্যান্ড এ সাত তুল, যেটা মহা কঠিন। আর এরা বকলম লোকজন নৌকা করে এসে দিব্যি জাকিয়ে বসেছে। হিউম্যান রাইটসের দোহাই দিয়ে সব সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। আর নন সিটিজেন দের সব ক্ষেত্রে ডাবল খরচ। এইটা কি ন্যায্য বিচার হল?

যাই হোক, এবার ঈদে এরকম কয়েকজন কে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল, আমার কাজিনের হাসবেন্ডের বাসায়। উনার মনে এইসব ক্লাস কনফ্লিক্ট কাজ করে না। বন্ধু তালিকায় হাই কমিশনার, লইয়ার, বোট পিপল সবাই আছে। দুজন বোট পিপল উনার বাসায় থাকে ফ্ল্যাটমেট হিসেবে। সত্যি বলতে কি এদের সাথে কথা বলে আমার খুব ভাল লেগেছে। আমার পরিচিত আপার ক্লাসে, খুব হুশ করে কথা বলতে হয়। কখন কোন কথায়, কোন কাজে কি মনে করে বসে? সেজেগুজে থাকতে হয়, নয়ত আমাকে ক্ষেত ভেবে বসতে পারে। আমাকে ফর্মালিটি মেইন্টেইন করতে হয়।

এই বোট পিপল রা ভারি দিলখোলা মানুষ। এখানে কন্সট্রাকশন ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করে। মাসে আমাদের দ্বিগুণ ইনকাম করে।গতবার দেশে যাবার সময় তার মায়ের জন্য প্রায় ৫ ভরি ওজনের বালা পাঠাল আমার কাছে। আমি নিতে চাইছিলাম না, সে বল্ল আল্লাহ ভরসা বলে নিয়ে যান, হারিয়ে গেলে কোন দাবি রাখব না।আমি আমার মা আর শাসুড়ির জন্যে কি নিলাম, সে কথা বলে আর লজ্জা পেতে চাই না।
ঈদে খাসির মাংস রান্না করে খাওয়াল, বিয়েবাড়ির রেজালা ফেইল তার কাছে। পরের দিন বেড়াতে গেলাম সবাই মিলে আমার বানানো অখাদ্য নুডলস আর চ্যাপটা হয়ে যাওয়া কেক খেয়ে এমন আন্তরিক প্রশংসা করতে লাগল, আমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হলাম, আমি বোধ হয় আসলেই ভাল রেঁধেছি।

ফেরার পথে তাদের বন্ধু দুজন কে বাসায় নামিয়ে দেবার পথে আমি আর আবির তাদের সাথে টুক্টাক গল্প করছিলাম, জিজ্ঞেস করলাম অস্ট্রেলিয়া কেমন লাগে। উনার নাম জানি না, সবাই কাকা ডাকছিল, দুখিত স্বরে বল্লেন, ভাল না, মালয়েশিয়া তেই ভাল ছিলেন। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম কেন? উনি বল্লেন, সেই দেশে উনার একটা নিজস্ব লাইফ ছিল, সম্মান ছিল, নিজের কন্সট্রাকশন বিজনেস ছিল। এদেশে সবাই কেমন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে, উনার খুব কষ্ট লাগে। জিজ্ঞেস করলাম, কে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে? এখানকার মানুষ ত এত খারাপ না। উত্তর দিলেন, বিদেশি রা কিছু করে নি, উল্টা উনার অভিজ্ঞতা বেশি বলে সবাই তার কাছে শিখতে আসে আগ্রহ করে, ডীগ্রি বা লেখাপড়া থাকলে হয়ত ট্রেনার বানিয়ে দিত। কিছু বাংলাদেশি মালিকানার বাড়িতে কাজ করতে গিয়েছিলেন, তারা ভাল ব্যবহার করে নি। বাংলাদেশি রাজমীস্ত্রী – যোগালির সাথে ভাল ব্যবহার করার আছেই কি?
আমি আর আবির লজ্জায় চুপ হয়ে গেলাম। আবির বল্ল, আপ্নি বলতে পারলেন না, জানেন আমার নিজস্ব কন্সট্রাকশন বিজনেস ছিল? কাকা দুখিত স্বরে বল্লেন কি লাভ বলে? চুপচাপ কাজ শেষ করে চলে এসেছি। আমি সান্তনা দেয়ার ভাষা না পেয়ে বল্লাম, ভাই আপ্নি মনে কষ্ট নিয়েন না। আমাদের দেশের মানুষ এমনই। এই যে দেখেন শখ করে ডাক্তার হয়েছিলাম, ভেবেছি মানুষ বোধ হয় সালাম আদাব দিয়ে কথা বলবে। কিসের কি, দেখলেই বলবে কসাই, কিচ্ছু জানি না, বেহুদা টেস্ট দিয়ে কমিশন খাই। সবারই এক অবস্থা। ভদ্রলোক মৃদু হেসে চুপ করে রইলেন, আর কিছু বল্লেন, উনার বাসা চলে এল হাসিমুখে বিদায় নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেলেন।

পরে আমার কাজিন থেকে জানলাম, এরা খালি হাতে এদেশে এসেছে ঠিকই। কিন্তু একেকজন কাজকর্ম করে দেশের বাড়িতে মার্কেট করে ফেলেছে। পরিবার এর সবাই কে এস্টাব্লিশ করেছে। মাসে লাখ টাকা দেশে পাঠায় পরিবার ভাল থাকবে বলে। আমাদের মত ক্রেডিট কার্ড বা হোম লোনে জর্জরিত লোকজন দের কয়েকজন কে তারা পকেটে ভরে রাখতে পারে।দেশে রেমিটেন্স যা যাচ্ছে এদেরই টাকা। আইন গত জটিলতার কারনে এরা দেশে যেতে পারে না, তবু দেশে থাকা আত্নীয়দের কথা ভেবে কাজ করে, স্বপ্ন দেখে একদিন দেশে ফিরে আসবে, ম্যাট্রিক পাস বঊ বিয়ে করবে, আর ৪-৫ টা বাচ্চা নিয়ে বাপ মা, ভাইবোন নিয়ে থাকবে।

আর আমরা সো কল্ড ক্লাসি পিপল দেশের খেয়ে পরে বড় হয়ে এদেশে এসে কোকে চুমুক দিতে দিতে বলি বাংলাদেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে, এদেশের কিস্যু হবে না। ছেলেমেয়ে কে একটা নিরাপদ জীবন দিতে চাইলে বাংলাদেশ না। হয়ত ভুল কিছু বলি না। এরকম স্বার্থপর লোকজন দেশে থেকে দেশের বোঝা বাড়িয়ে লাভ নেই।

বিদেশের সবচেয়ে চমতকার দিক কোন টা? বলেন ত? ফুল পাখি সমুদ্র? নিরাপদ জীবন? ভেজাল বিহীন খাবার? হতে পারে। আমার কাছে ভাল লাগে ইকুয়েলিটি। হতে পারে লোক দেখানো, তবু ভাল লাগে। বাস থেকে নামার সময় ড্রাইভার কে থ্যাংক্স দিই। বয়স্ক ড্রাইভার হাসিমুখে বলে থ্যাংক্স লাভ। ড্রাইভার আমাকে লাভ ডাকছে, এত্ত সাহস? নাহ, সেরকম কিছু মনে হয় না। কমন এড্রেসিং ওয়ার্ড, হাই মেট! সবাই বন্ধু। প্লাম্বার বা ইলেক্ট্রেশিয়ান কখনো জি হুজুর এটিচুড নিয়ে সামনে দাড়ায় না। সাদা চামড়া দেখলে আমরা বাংগালিরাও ক্লাস ভুলে বন্ধুভাবাপন্ন হয়ে যাই। আমি কি করি, আমার স্বামী কি করে, এই উত্তর কার কাছে কেমন লাগবে, এই নিয়ে কখনো বিব্রত হতে হয় না।বরঞ্চ বাংলাদেশি, ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানী লোকজন এর এটিচুড বুঝিয়ে দেয়, আমি এশিয়ান ব্রাউন পিপল, আমাকে অত পাত্তা দেয়ার দরকার নেই। তখন কিন্তু ঠিকই কষ্ট লাগে।

মাঝেমাঝে ভাবি, ক্লাস ডিফারেন্স জিনিস টা কি আসলেই খুব প্রয়োজনীয় কিছু, যেটা মানতেই হবে? কি হয়, কাজের লোক, রিকশাওয়ালা, ময়লাআলা লোক গুলির সাথে ভাল ব্যবহার করলে? গরীব আত্নীয়টার পাতে বড় মাছ টা দিলেই ক্ষতি কি, দুরসম্পর্কের ওই বড়লোক আত্নীয় কে একটু কম তোয়াজ করলে খুব অনর্থ হয়ে যাবে?

লেখিকা-অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী চিকিৎসক

Check Also

সাবিনা ইয়াসমিন

ফিরোজা পদক, সাবিনা ইয়াসমিন এবং কিছু কথা

মৃত্যুর দু’বছর পর প্রথম বারের মতো ফিরোজা পদক দেয়া হলো। গলায় তুললেন সাবিনা ইয়াসমিন, বাংলার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *